হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের নৌ-অবরোধ: রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার শঙ্কা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 13 Apr, 2026
দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করার জেরে পাকিস্তানের ইসলামাদে চলমান শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেঙে গেছে।
এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে 'টার্গেটেড' নৌ-অবরোধের (Naval Blockade) নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজার ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে তাৎক্ষণিকভাবে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, সোমবার ইস্টার্ন টাইম (ET) সকাল ১০টা (বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অবরোধ শুরু হচ্ছে। মার্কিন রণতরীগুলো ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান নিয়েছে। সেন্টকমের ভাষ্যমতে, এই অবরোধ মূলত ‘টার্গেটেড’।
অর্থাৎ, শুধুমাত্র ইরানের বন্দরগুলোতে আসা বা সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া বাণিজ্যিক ও জ্বালানি তেলের জাহাজগুলোর ওপর তল্লাশি চালানো হবে এবং তাদের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে। তবে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ যা ইরানের সাথে যুক্ত নয়, তাদের চলাচলে কোনো বিঘ্ন ঘটানো হবে না।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেছেন, *"কোনো দেশ বা গোষ্ঠী যদি ইরানকে অবৈধভাবে 'টোল' বা মাশুল দিয়ে এই প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করে, তবে আন্তর্জাতিক জলসীমাতেই তাদের রুখে দেওয়া হবে।"* তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, ইরানি বাহিনী যদি মার্কিন বা কোনো শান্তিপূর্ণ জাহাজে হামলা চালায়, তবে তার জবাব হবে অত্যন্ত কঠোর।
তেহরানের পাল্টা হুমকি ও রাশিয়ার অবস্থান
মার্কিন এই পদক্ষেপকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC)। তেহরান জানিয়েছে, মার্কিন নৌবাহিনী যদি তাদের জাহাজ চলাচলে বিন্দুমাত্র বাধা দেয়, তবে তারা পুরো হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন এই অবরোধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বেইজিং এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ মার্কিন পদক্ষেপকে উপহাস করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকট সমাধান করতে পারবে না।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
অবরোধের ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।
সোমবার বিকেলেই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
বিভক্ত পশ্চিমা মিত্ররা
ট্রাম্পের এই একতরফা সিদ্ধান্তে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
ব্রিটেন ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে তারা এই অবরোধে অংশ নেবে না। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও জানিয়েছেন যে, তার দেশ এই অভিযানে যুক্ত হওয়ার কোনো অনুরোধ পায়নি এবং বর্তমানে তাদের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।
সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অগ্নিকুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন নৌবাহিনীর টহল এবং ইরানের পাল্টা হামলার ঝুঁকি থেকে যেকোনো সময় বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে।
চীন ও রাশিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্ব কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে কি না।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

